কারগিলের সেই প্রথম অমর শহীদ এবং এক নিঃশব্দ প্রতিশোধের মহাকাব্যঃ ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া

ফিচার স্টোরি
জুন মাসের এক তপ্ত দুপুর । নর্দান কম্যান্ড সেনা দপ্তর থেকে একরকম হতাশ হয়ে বেরিয়ে এলেন ডক্টর নির্মল কালিয়া । দু সপ্তাহ ঘোরাঘুরির পরও ছেলের নৃশংস হত্যার কোন বিচার পেলেন না । আজ সেনাধ্যক্ষ কে বলেই ফেললেন Our country has spineless leaders ! কি হয়েছিল তাঁর ছেলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন সৌরভের সাথে…?
সৌরভের জন্ম ২৯শে জুন ১৯৭৬। বাবা নির্মল কালিয়া ছিলেন CSIR এর বিজ্ঞানী। হিমাচল প্রদেশের পালামপুরে পড়াশোনার পর ১৯৯৭ এ বিজ্ঞানে স্নাতক হন। কম্বাইন্ড ডিফেন্স সার্ভিস পরীক্ষার মাধ্যমে ১৯৯৮ এ সেনাবাহিনী তে কমিশনড পান। প্রথম পোস্টিং ৪নং জাঠ রেজিমেন্টে। কারগিল এলাকায় কাকসার সেক্টরে রুটিন টহলদারির দায়িত্বে ছিলেন তখন। দিনটা ছিলো ১৫ই মে, ১৯৯৯। কয়েকজন মেষপালকের কাছে অনুপ্রবেশের খবর পেয়ে পাঁচ সেনা জওয়ানকে সাথে নিয়ে পৌঁছে যান নিয়ন্ত্রণ রেখার কাছাকাছি। ঘুণাক্ষরেও ধারণা করতে পারেননি উপজাতীয় হানাদারদের সাথে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়মিত সদস্যরাও পুরো তৈরি হয়ে ঢুকে পড়েছে ভারত ভূমিতে। ঘন্টা কয়েক গুলি বিনিময়ের পর শেষ হয়ে যায় তাদের রসদ। বাইশ বছরের ক্যাপ্টেন কালিয়া সহ ছজন ভারতীয় সেনাই ধরা পড়েন পাক হানাদারদের হাতে। পাকিস্তানের রেডিও স্কারদু ঘটা করে প্রচার করে এই সেনা বন্দীর খবর। আর এই ঘটনার পরেই ফাঁস হয়ে যায় কিভাবে পাকসেনা গুরুত্বপূর্ণ সব পাহাড় চূড়ায় ঘাঁটি গেড়ে বসে গেছে।
প্রায় তিন সপ্তাহ পর ৯ই জুন, চটে মুড়ে ফেরত এলো তাদের লাশ । শরীরের হাল দেখে অতি বড় সাহসী সেনার বুক কেঁপে গেল । মধ্যযুগীয় বীভৎসতাকেও হার মানিয়েছে পাক অত্যাচার ।
সারা শরীরে অজস্র চুরুটের ছেঁকা, গরম শিক দিয়ে ফাটিয়ে দেয়া হয়েছে কানের পর্দা, চোখ উপড়ে নেয়া, সব দাঁত ভাঙ্গা, নাক ও ঠোঁট কেটে নেওয়ার পর হাত পায়ের আঙুল সমেত যৌনাঙ্গ থেঁতলে দেয়া হয়েছে ! সবশেষে মাথায় গুলি করে হত্যা । যুদ্ধবন্দীদের ওপর এই অত্যাচার জেনেভা চুক্তি বিরোধী। বিদেশ মন্ত্রক দিল্লির পাক হাইকমিশনারকে ডেকে পাঠিয়ে ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান। পাক বিদেশ মন্ত্রী সরতাজ আজিজকে পুরো ঘটনা জানিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবার নির্দেশ দেয়া হয়। ব্যাস ঐ পর্যন্তই।
বিচারের আশায় শুরু হলো এক শহীদের পিতার লড়াই। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন থেকে সুপ্রীম কোর্ট, কোথায় না কড়া নেড়েছেন তিনি। আবেদন জানিয়েছেন ইসলামাবাদে, এমনকি পারভেজ মোশাররফের ভারত ভ্রমনের সময় দেখা করতে চেয়েছেন তাঁর সাথে। যদিও মঞ্জুর হয়নি সেই আবেদন। বারবার ভারত সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন ঘটনাটি আন্তর্জাতিক আদালতে উপস্থাপন করার জন্য, অজানা কারণে সরকার বদল হলেও তার আশা পূরণ হয়নি কারগিল বিজয়ের দুই দশক পেরিয়েও…..!
সত্যিই কি কোন পদক্ষেপই নেয়া হয়নি নৃশংস ঐ হত্যার বিরুদ্ধে……?
পাকিস্তান কে বারবার জানিয়েও যখন কোন ফল হলোনা তখন সেনাদপ্তর নিল এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত । Forgive & Forget এই শব্দ দুটো সেনা অভিধানে নেই । Army Intelligence কে সমস্ত তথ্য জানান হলো ।
প্রস্তুতি: দিন দশেকের চেষ্টায় নিশ্চিত ভাবে জানা গেল বালুচ রেজিমেন্টের এক মেজরের নেতৃত্বে ঘটেছে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড । সীমান্তবর্তী স্কারদু উপত্যকায় তারা ঘাঁটি গেড়েছে। দুটো মেশিন গান সহ বাইশ জন পাক সেনাও সেখানে মজুত।
তৈরী হলো দশ সেনা নিয়ে Special Strike force. তাদের দেয়া হলো Tavore রাইফেল, M4A1 কারবাইন, PK মেশিন গান, SV_98 স্নাইপার রাইফেল ,সাথে নাইট ভিশন গগলস ও থার্মালস্কোপ । কভার করার জন্য পেছনে আরও আট সেনা । সেনাধ্যক্ষের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল: “Leave No Survivors , Carry Casualties back , extract any shell or ammunition used and finally make the enemy feel the wrath.”
#আক্রমণ : আনুষ্ঠানিক ভাবে তখন শেষ হয়েছে কারগিল যুদ্ধ। ঠিক করা হয়েছিল এক নিশুতি রাত । ঘড়িতে এগারোটা বাজতই LoC পেরিয়ে গেল Strike force এর জওয়ানরা । হায়েনার ক্ষিপ্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়লো ঐ পাক ছাউনির ওপর , ভেসে গেল তাদের সব প্রতিরোধ । বাইশ জন সেনাই নিহত হয়েছিল, আর সেই মেজর ?
মেরে ফেলার আগে তাকে নরক দর্শন করানো হয়েছিল । সার্জিকাল স্ট্রাইকের প্রমাণ রাখার জন্য ভারতীয় সেনা পাকিদের রক্তে ক্যাম্পের দেয়ালে লিখে এসেছিল
“We are the predators
While our enemy is our prey
We are the masters of Violence,
While all you are mere tenants”.‌
পাক সেনাদের হাতে বন্দী অবস্থায় নৃশংস ভাবে নিহত প্রতিটি ভারতীয় সেনার বদলা আগেও নেয়া হয়েছে এখনও হয়ে থাকে । তথ্য প্রমান রেখে চালানো যায়না এই অপারেশন, তাই বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা কেবল এতে সন্দেহ প্রকাশ করে থাকেন। তবে সবচেয়ে দুঃখজনক এই কম্যান্ডো অপারেশনে নিহত সেনাদের জন্য কোন প্রচার নেই পুরস্কারও নেই!
Disclaimer: কম্যান্ডো অপারেশনে অংশ নেয়া প্রাক্তন এক সেনা অফিসারের Outlook ম্যাগাজিনে দেয়া বর্ণনা অনুসারে লেখা। নিরাপত্তার কারণে নাম উল্লেখ করা হয়নি।বিশ্বাস বা অবিশ্বাস পাঠকের ওপর নির্ভর করছে ।
কলমে: স্বপন সেন
SOURCES:
১. উইকিপিডিয়া : Captain Saurabh Kalia