জম্মু ও কাশ্মীর। রাজৌরি জেলা। শাহদারা শরিফ গ্রাম। দুর্গম পাহাড় আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা এক জনপদ। ভারতের মানচিত্রে হয়তো একে খুঁজে পেতে আতশ কাঁচ লাগবে, কিন্তু ২০০৯ সালের এক ঝড়ের রাতে এই গ্রামটিই হয়ে উঠেছিল সাহসিকতার এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তারিখটা ছিল ২৭ সেপ্টেম্বর। রাত তখন সাড়ে ৯টা। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে, সাথে হাড়কাঁপানো হাওয়া। গ্রামের সবাই তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। নূর হোসেনের মাটির বাড়িতেও নিভে গেছে আলো। কিন্তু অন্ধকারের আড়ালে তিনটে ছায়া নিঃশব্দে এগিয়ে এল তাদের বাড়ির দিকে। তারা সাধারণ চোর-ডাকাত নয়, তারা পাকিস্তানের কুখ্যাত জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈবার দুর্ধর্ষ সদস্য। তাদের নেতৃত্বে ছিল আবু ওসামা— লস্করের এক সিনিয়র কমান্ডার, যার মাথার দাম ছিল লক্ষ টাকা।
দরজায় ধড়াম করে লাথি পড়ল। কাঠের দরজা ভেঙে পড়ার উপক্রম। নূর হোসেন দরজা খুলতেই তাকে বন্দুকের বাট দিয়ে সজোরে আঘাত করে মাটিতে ফেলে দিল জঙ্গিরা। তারা চিৎকার করে খাবার চাইল, টাকা চাইল। নূর হোসেন প্রতিবাদ করতেই শুরু হলো অকথ্য মারধর। বাড়ির মহিলারা ভয়ে কুঁকড়ে গেল। জঙ্গিদের চোখেমুখে ছিল খুনের নেশা। তারা জানত, এই নিরপরাধ গ্রামবাসীদের মারলে তাদের কেউ আটকাতে আসবে না। কিন্তু তারা জানত না, এই কোলাহলের মাঝেও একজন স্থির ছিল। নূর হোসেনের ২০ বছর বয়সী মেয়ে রুকসানা কাউসার।
রুকসানা তখন তার ভাইয়ের সাথে খাটের নিচে লুকিয়ে ছিলেন। চোখের সামনে বাবাকে রক্তাক্ত হতে দেখে তার রক্ত গরম হয়ে উঠল। ভয়ের বদলে তার শিরায় শিরায় বয়ে গেল এক অদ্ভুত জেদ। তিনি জানতেন, আজ যদি তিনি রুখে না দাঁড়ান, তবে এই নরপশুরা তার পুরো পরিবারকে শেষ করে দেবে। তার হাতের কাছেই পড়ে ছিল কাঠ কাটার একটি ধারালো কুঠার। রুকসানা সেই কুঠারটি শক্ত হাতে চেপে ধরলেন। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এল, কিন্তু হাত কাঁপল না।
আবু ওসামা তখন একে-৪৭ উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে ভাবতেও পারেনি এই নিরীহ পরিবারের কেউ তাকে পাল্টা আঘাত করতে পারে। সে যখন নূর হোসেনের দিকে বন্দুক তাক করল, ঠিক সেই মুহূর্তেই বাঘিনীর মতো খাটের নিচ থেকে বেরিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন রুকসানা। অন্ধকারের মধ্যে বিদ্যুৎগতিতে নেমে এল তার কুঠার। সরাসরি আবু ওসামার ঘাড়ে।
“খচাত!”— মাংসে কুঠার গেঁথে যাওয়ার শব্দ। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল। যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল লস্কর কমান্ডার। তার হাত থেকে খসে পড়ল একে-৪৭ রাইফেলটি। আবু ওসামা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, তার চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে এক সাধারণ মেয়ে তাকে মৃত্যু উপহার দিয়েছে।
রুকসানা এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করলেন না। তিনি কুঠার ফেলে তুলে নিলেন জঙ্গির রাইফেল। আবু ওসামা তখনো মাটিতে ছটফট করছে। অন্য দুই জঙ্গি— যারা বাইরে পাহারায় ছিল— গুলির শব্দ বা চিৎকার শুনে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করল। রুকসানা তখন আর সাধারণ মেয়ে নন, তিনি এক পুরোদস্তুর যোদ্ধা। তিনি নিজের ভাই আইজাজকে বললেন বাবার রাইফেলটা আনতে। ভাই-বোন মিলে শুরু করলেন এক অবিশ্বাস্য গুলিবর্ষণ।
রুকসানা আবু ওসামার রাইফেল দিয়ে গুলি চালালেন অন্য জঙ্গিদের দিকে। তার নিখুঁত নিশানায় ঘায়েল হলো আরেক জঙ্গি। আবু ওসামা ততক্ষণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা গেছে। যে লোকটা কাশ্মীরজুড়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল, সে আজ এক তরুণীর পায়ের কাছে মৃত কুকুরের মতো পড়ে আছে। বাকি জঙ্গিরা এই প্রতিরোধ দেখে ভড়কে গেল। তারা ভাবল হয়তো বাড়িতে পুলিশ বা আর্মি লুকিয়ে আছে। তারা গ্রেনেড ছুঁড়ে পালিয়ে গেল পাহাড়ে।
রাত তখন ১১টা। বাইরে তুমুল বৃষ্টি, আর ঘরের ভেতরে রক্ত, বারুদ আর লাশের স্তূপ। রুকসানা এবং তার পরিবার সারারাত জেগে রইল পাহারায়। তাদের ভয় ছিল জঙ্গিরা আবার ফিরে আসতে পারে। সকালের আলো ফুটতেই তারা আবু ওসামার লাশ এবং তার একে-৪৭ রাইফেলটি নিয়ে সোজা পুলিশ স্টেশনে হাজির হলেন। পুলিশ অফিসাররা নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি আবু ওসামা— যাকে ধরার জন্য সেনাবাহিনী দিনরাত এক করেছে, তাকে খতম করেছে এই সাধারণ মেয়েটি!
এই খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। রুকসানা কাউসার হয়ে উঠলেন সাহসিকতার প্রতীক। জঙ্গিরা তাকে মেরে ফেলার হুমকি দিল, তার বাড়িতে গ্রেনেড হামলা করল। কিন্তু রুকসানা দমে যাননি। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, “আমি যদি সেদিন ভয় পেতাম, তবে আজ আমার পরিবার বেঁচে থাকত না। আমি মরতে ভয় পাই না, কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করব না।”
ভারত সরকার তার এই অসীম সাহসিকতার জন্য তাকে ‘কীর্তি চক্র’ সম্মানে ভূষিত করে— যা ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শান্তিকালীন সাহসিকতার পুরস্কার। তার ভাই আইজাজকেও শৌর্য চক্র দেওয়া হয়। রুকসানা আজ জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশের কনস্টেবল পদে কর্মরত, দেশের সেবা করে যাচ্ছেন।
আজকের দিনে আমরা নারীশক্তির কথা বলি, কিন্তু ২০০৯ সালের সেই রাতে রাজৌরির এক অন্ধকার ঘরে রুকসানা কাউসার যা করেছিলেন, তা নারীশক্তির চূড়ান্ত উদাহরণ। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, সন্ত্রাসবাদীদের সবচেয়ে বড় ভয় কোনো আধুনিক অস্ত্র নয়, তাদের ভয় হলো সাধারণ মানুষের জেগে ওঠা সাহস। আবু ওসামার লাশটি হয়তো মাটিতে মিশে গেছে, কিন্তু রুকসানা কাউসারের সেই কুঠারের আঘাত আজও ইতিহাসের পাতায় এক গভীর চিহ্ন রেখে গেছে। তিনি শিখিয়েছেন, বাঘের ডেরায় ঢুকে বাঘ শিকার করতে হলে, কলিজাটা বাঘের চেয়েও বড় হতে হয়।
স্যালুট রুকসানা কাউসার। আপনি ভারতের সত্যিকারের ‘শেরনি’।
Source & Disclaimer:
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া: Rukhsana Kausar