তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া আবুল পাকির জয়নুলাবেদিন আব্দুল কালামের জীবন শুরু হয়েছিল এক কঠিন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। শৈশবে পরিবারের খরচ জোগাতে তিনি বাড়ি বাড়ি খবরের কাগজ বিক্রি করতেন। কিন্তু তাঁর দু-চোখে ছিল মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন। ল্যাবরেটরির মতো নিখুঁত শৃঙ্খলায় তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং পরবর্তীকালে মাদ্রাসা ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে মহাকাশ বিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেন। ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ISRO) এবং প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা (DRDO)-তে তাঁর অবদান ভারতকে বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোর কাতারে দাঁড় করিয়েছে। এসএলভি-৩ (SLV-III) রকেটের সফল উৎক্ষেপণ ছিল তাঁর মগজাস্ত্রের প্রথম বড় বিজয়।
কালামের জীবনের শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক সাফল্য ছিল ১৯৯৮ সালের পোখরান-২ পারমাণবিক পরীক্ষা। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে কালাম এবং তাঁর দল ছদ্মবেশে রাজস্থানের মরুভূমিতে সেই রুদ্ধশ্বাস অপারেশন পরিচালনা করেছিলেন যাতে সিআইএ-র স্যাটেলাইটও তাঁদের ধরতে না পারে। ল্যাবরেটরির কোনো কেমিক্যাল রিঅ্যাকশনের চেয়েও নিখুঁত ছিল সেই পরিকল্পনা, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন শক্তি’। এই সাফল্যের পর ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কালাম হয়ে ওঠেন ভারতের ‘মিসাইল ম্যান’, যাঁর হাত ধরে তৈরি হয়েছিল অগ্নি ও পৃথ্বীর মতো মারণাস্ত্র।
২০০২ সালে তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি ভবনের জৌলুস কোনোদিন তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি ছিলেন ‘পিপলস প্রেসিডেন্ট’ বা জনগণের রাষ্ট্রপতি। ল্যাবরেটরির কোনো প্রোটোকলের চেয়ে তিনি সাধারণ মানুষের সাথে, বিশেষ করে ছোট বাচ্চাদের সাথে সময় কাটাতে বেশি ভালোবাসতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিশুদের স্বপ্নই পারবে ভারতকে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে। তাঁর লেখা ‘উইংস অফ ফায়ার’ এবং ‘ইগনাইটেড মাইন্ডস’ বইগুলো আজও কয়েক কোটি তরুণের অনুপ্রেরণার উৎস। রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়ার সময় তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল স্রেফ কিছু জামাকাপড়, কয়েকটি সিডি এবং তাঁর অত্যন্ত প্রিয় ৩০০০-এর বেশি বই।
এ পি জে আব্দুল কালামের সততা আর সরলতা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। একবার রাষ্ট্রপতি ভবনে তাঁর আত্মীয়রা বেড়াতে এলে তাঁদের খাওয়ার খরচ তিনি নিজের পকেট থেকে দিয়েছিলেন, সরকারি টাকা ব্যবহার করেননি। এমনকি তাঁর মৃত্যুও হয়েছিল তাঁর প্রিয় কাজ করতে গিয়ে—মেঘালয়ের শিলংয়ে ছাত্রদের উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ল্যাবরেটরির মতো গোছানো তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তটিও ছিল জ্ঞান বিলিয়ে দেওয়ার এক মহৎ উদাহরণ। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে তেরঙার সবথেকে বড় সম্মান কোনো পদে নয়, মানুষের ভালোবাসার মধ্যে নিহিত থাকে।
বর্তমানে ভারত যে উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গৌরব করে, তার মূলে রয়েছে কালামের সেই দীর্ঘদিনের সাধনা। তেরঙার নীল চক্রের গতির মতো তাঁর আদর্শ আজও ভারতের প্রতিটি কোণায় প্রতিধ্বনিত হয়। তিনি ছিলেন এমন একজন ‘ভালো মানুষ’, যাঁকে ঘৃণা করার মতো কোনো শত্রুও খুঁজে পাওয়া ভার। ডঃ কালাম কেবল একজন বিজ্ঞানী বা রাষ্ট্রপতি ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভারতের নৈতিকতা আর অদম্য সাহসের এক জাদুকরী ও গৌরবোজ্জ্বল মহাকাব্য। তাঁর সেই অমলিন হাসি আজ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে—স্বপ্ন সেটা নয় যেটা মানুষ ঘুমিয়ে দেখে, স্বপ্ন হলো সেটাই যা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না।
সোর্স :
উইকি : A. P. J. Abdul Kalam (Scientist and former President of India)