প্যারিসের ক্যাফে থেকে ইরান বিপ্লব—ছদ্মবেশে ভারতের সেই ‘মাস্টার স্পাই’ বি. রমন

ফিচার স্টোরি
সাল ১৯৭৮। প্যারিসের এক ধোঁয়াশাচ্ছন্ন ক্যাফে। সেখানে বসে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছেন এক ভারতীয় ভদ্রলোক। হাতে নোটবুক, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। সবাই জানে তিনি ‘দ্য হিন্দু’ (The Hindu) পত্রিকার প্যারিস করেসপন্ডেন্ট বা সাংবাদিক। কিন্তু এই পরিচয়টা ছিল কেবলই একটা মুখোশ। চশমার আড়ালের ওই তীক্ষ্ণ চোখ দুটো আসলে খুঁজছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় পালাবদলের সূত্র। তিনি আর কেউ নন, তিনি ছিলেন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (R&AW)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং কাউন্টার-টেররিজম ইউনিটের প্রধান—বি. রমন (B. Raman)।
প্যারিস অপারেশন এবং ইরানের বিপ্লব সেই সময় ইরানে চলছে এক ভয়াবহ অস্থিরতা। শাহের পতন আসন্ন। আর বিপ্লবের নায়ক আয়াতুল্লাহ খোমেনি তখন প্যারিসে নির্বাসিত। বিশ্বের তাবড় তাবড় গোয়েন্দা সংস্থা—সিআইএ (CIA), কেজিবি (KGB)—সবাই চেষ্টা করছে খোমেনির নাগাল পেতে, কিন্তু ব্যর্থ হচ্ছে। ঠিক তখনই জাদুকরের মতো চাল চাললেন বি. রমন। বহু বছর আগে তিনি এক ইরানি ছাত্রের জীবন বাঁচিয়েছিলেন। ভাগ্যের চাকা ঘুরে সেই ছাত্রটিই হয়ে উঠেছিল খোমেনির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। সাংবাদিকের ছদ্মবেশে থাকা রমন সেই পুরনো সম্পর্কের সুতো ধরে সোজা পৌঁছে গেলেন আয়াতুল্লাহ খোমেনির অন্দরমহলে। সিআইএ যা পারেনি, তা করে দেখালেন ভারতের এই স্পাই। তিনি খোমেনি এবং তার বিপ্লবীদের সাথে ভারতের এক গোপন ‘ব্যাক চ্যানেল’ (Back Channel) তৈরি করলেন। ইরানের শাহের পতন এবং ইসলামিক বিপ্লবের সেই উত্তাল সময়ে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করতে রমন যে ভূমিকা রেখেছিলেন, তা আজও স্পাই দুনিয়ায় এক রূপকথা হয়ে আছে।
দ্য কাউবয়েজ অফ ‘র’ (The Kaoboys of R&AW) বি. রমন ছিলেন ১৯৬১ ব্যাচের আইপিএস অফিসার। কিন্তু তার আসল জায়গা পুলিশ স্টেশন ছিল না, ছিল ছায়ার জগত। ১৯৬৮ সালে যখন রামেশ্বর নাথ কাও (R.N. Kao) ভারতের নতুন গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তিনি হীরের জহুরির মতো বেছে নিয়েছিলেন রমনকে। কাও-এর হাতে গড়া এই অফিসারদের বলা হতো “কাও-বয়েজ” (Kaoboys)। রমনের স্মৃতিশক্তি ছিল কম্পিউটারের মতো। দশকের পর দশক পুরনো ঘটনার খুঁটিনাটি তিনি হুবহু মনে রাখতে পারতেন। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং চীনের ওপর তার বিশ্লেষণ ছিল অভ্রান্ত। বলা হয়, ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলের ব্লু-প্রিন্ট তার হাত ধরেই তৈরি হয়েছিল।
একাকী জীবন ও নীরব বিদায় যিনি সারা জীবন দেশের জন্য বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন একদম একা। তিনি বিয়ে করেননি। ১৯৬৩ সাল থেকে আমৃত্যু তিনি একাই থেকেছেন। তার সঙ্গী ছিল শুধু তার কাজ আর দেশের গোপন নথিপত্র। মাঝে কিছুদিন অসুস্থ মায়ের সেবা করেছিলেন, কিন্তু মা মারা যাওয়ার পর আবার সেই একাকীত্ব। শেষ বয়সে শরীরে বাসা বাঁধে মারণরোগ ক্যান্সার। ২০১৩ সালের ১৬ জুন। চেন্নাইয়ের এক হাসপাতালে ৭৭ বছর বয়সে নীরবে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন এই মাস্টারমাইন্ড। মৃত্যুর আগে তিনি লিখে গিয়েছেন তার স্মৃতিচারণমূলক বই—”The Kaoboys of R&AW: Down Memory Lane”। যেখানে তিনি সামান্য কিছু পর্দা সরিয়েছেন তার রহস্যময় জীবনের, কিন্তু বেশিরভাগটাই হয়তো চলে গেছে তার সাথে—চিতার আগুনে।
বি. রমন শুধু একজন অফিসার ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভারতের সেই অদৃশ্য ঢাল, যিনি ছায়ায় থেকে দেশ রক্ষা করেছেন, অথচ কেউ তার নামটাও জানত না।
সোর্স:
১/ Wikipedia: B. Raman
২/ The Indian Express: “B Raman, one of RAW founders, passes away” (17 June 2013

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *