ছত্তিশগড়ের বস্তার জেলা। ভারতের মানচিত্রে এক লাল বিন্দু, যেখানে ঘন জঙ্গল আর পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকে নকশাল বিদ্রোহীরা। এখানকার বাতাসেও বারুদের গন্ধ, আর প্রতিটি পদক্ষেপে মৃত্যুর হাতছানি। সিআরপিএফ-এর দুর্ধর্ষ জওয়ানরাও এখানে পোস্টিং পেতে দুবার ভাবে। কিন্তু এই মৃত্যুপুরীতেই স্বেচ্ছায় পোস্টিং চেয়েছিলেন এক ২৮ বছর বয়সী তরুণী অফিসার, যার নাম ঊষা কিরণ। তিনি কেবল একজন সিআরপিএফ অ্যাসিস্ট্যান্ট কমান্ড্যান্ট নন, তিনি ভারতের প্রথম মহিলা কোবরা (CoBRA – Commando Battalion for Resolute Action) কমান্ডো, যাকে স্থানীয়রা চেনে ‘লেডি সিংঘম’ নামে।
ঊষা কিরণের গল্পটা কোনো সাধারণ মেয়ের গল্প নয়। তিনি চাইলেই জম্মু-কাশ্মীর বা উত্তর-পূর্ব ভারতের অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় পোস্টিং নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি বেছে নিলেন ছত্তিশগড়ের সেই দুর্গম এলাকা, যেখানে নকশালরা ৫২ বছর ধরে তাদের রাজত্ব চালাচ্ছে। ২০১৪ সালে সিআরপিএফ-এর ২৩২ মহিলা ব্যাটালিয়নে যোগ দেওয়ার পর তিনি অনুরোধ করেছিলেন পুরুষ ব্যাটালিয়নের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ার। তাঁর এই সাহসিকতা দেখে সিনিয়ররাও অবাক হয়েছিলেন। প্রাক্তন ন্যাশনাল অ্যাথলিট ঊষা জানতেন, জঙ্গল যুদ্ধে ফিটনেস আর মনের জোরই আসল অস্ত্র।
বস্তারের জঙ্গলে তাঁর প্রথম দিনটি ছিল বিভীষিকাময়। ক্যাম্পের নিস্তব্ধতা চিরে হঠাৎই ভেসে এল আইইডি বিস্ফোরণের বিকট শব্দ। রক্তে ভেসে যাচ্ছে এক জওয়ান, যন্ত্রণায় ছটফট করছে। হেলিকপ্টার যখন তাকে উদ্ধার করতে এল, তখন সেই জওয়ান ঊষাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “ম্যাম, আমি কি আর কোনোদিন আমার মেয়েকে দেখতে পাব?” সেই মুহূর্তটি ঊষার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, এই লড়াই শুধু বন্দুকের নয়, এই লড়াই অস্তিত্বের। ভয়কে জয় করে তিনি হয়ে ওঠেন নকশালদের ত্রাস। গভীর রাতে যখন জঙ্গল নিঝুম হয়ে যায়, তখন ঊষা কিরণ তাঁর একে-৪৭ নিয়ে বেরিয়ে পড়েন অপারেশনে, পুরুষ কমান্ডোদের নেতৃত্ব দিয়ে।
কিন্তু ঊষা কিরণ কেবল একজন যোদ্ধাই নন, তিনি বস্তারের আদিবাসী মহিলাদের কাছে এক আশার আলো। নকশালরা প্রচার করত যে পুলিশ বা সিআরপিএফ মানেই ধর্ষণ আর অত্যাচার। কিন্তু ঊষা সেই মিথ ভেঙে দিয়েছেন। তিনি গ্রামের মহিলাদের সাথে কথা বলেন, তাদের সমস্যা শোনেন, স্কুল ছাত্রীদের পড়ান। তাঁর উপস্থিতিতে গ্রামের মহিলারাও নিরাপদ বোধ করে। এক হাতে বন্দুক আর অন্য হাতে চক-ডাস্টার নিয়ে তিনি লড়ে যাচ্ছেন এক দ্বিমুখী লড়াই—একদিকে নকশালদের বুলেট, অন্যদিকে অশিক্ষা আর ভয়ের অন্ধকার।
২০১৮ সালে ‘ভোগ’ ম্যাগাজিন তাঁকে ‘ইয়াং অ্যাচিভার অফ দ্য ইয়ার’ পুরস্কারে ভূষিত করে। গ্ল্যামারাস গাউন পরা বলিউড তারকাদের ভিড়ে ইউনিফর্ম পরা ঊষা কিরণ ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। পুরস্কার হাতে নিয়ে তিনি বলেছিলেন, “এই সম্মান আমার একার নয়, এটি সেই সব জওয়ানের যারা দেশের জন্য রক্ত ঘাম ঝরাচ্ছে।” আজ ঊষা কিরণ কেবল একটি নাম নয়, তিনি সাহসিকতার এক জীবন্ত প্রতীক। বস্তারের জঙ্গলে তাঁর পায়ের ছাপ প্রমাণ করে দিয়েছে যে, নারীরা চাইলে বাঘের ডেরায় ঢুকেও থাবা বসাতে পারে।
SOURCES
১. National Herald : “Woman CoBRA commando Usha Kiran from Bastar breaks stereotypes within the Indian military”
২. The Better India : “Posted in Bastar, Usha Kiran Is the First Woman Officer of the Elite Commando Force Cobra!”
৩. ED Times : “Real Lady Singham: Usha Kiran: First Woman COBRA Commando Who Asked To Get Posted In Hostile Areas”
৪. SSBCrack : “Meet Usha Kiran, 1st Woman COBRA Commando and Vogue Woman Of The Year”
৫. Wikipedia : “Central Reserve Police Force”