২০১০ সাল। আমেদাবাদের স্টার্লিং হাসপাতালের করিডোরে তখন অদ্ভুত এক থমথমে নিস্তব্ধতা। হাসপাতালের একটা বিশেষ উইং পুরোপুরি খালি করে দেওয়া হয়েছে। বাইরে মোতায়েন করা হয়েছে কড়া নিরাপত্তা। সাধারণ কোনো রোগী নয়, সেখানে পরীক্ষা চলছে এমন এক মানুষের, যাঁকে নিয়ে খোদ ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা বা ডিআরডিও (DRDO) বিচলিত। ঘরের ভেতর সাদা ধবধবে বিছানায় বসে আছেন ৮২ বছরের এক বৃদ্ধ। পরনে টকটকে লাল শাড়ি, কানে দুল, আর নাকে নোলক। তাঁকে দেখে চেনা দায় যে ইনিই কি সেই মানুষ, যাঁর দাবি আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। মানুষটির নাম প্রহ্লাদ জানি, যাঁকে ভক্তরা ‘চুনরিওয়ালা মাতাজি’ বলে ডাকতেন। তাঁর দাবি ছিল, ১৯৪০ সাল থেকে অর্থাৎ দীর্ঘ সত্তর বছর তিনি এক দানা অন্ন বা এক ফোঁটা জল মুখে তোলেননি।
বিজ্ঞান বলে, মানুষ খাবার ছাড়া বড়জোর কয়েক সপ্তাহ বাঁচতে পারে, কিন্তু জল ছাড়া তিন দিনের বেশি টিকে থাকা অসম্ভব। তাহলে এই বৃদ্ধ বেঁচে আছেন কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ডিআরডিও-র বিজ্ঞানী ড. সুধীর শাহ এবং ৩৫ জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের একটি দল প্রহ্লাদ জানিকে এক কঠোর পরীক্ষার মুখে দাঁড় করালেন। পনেরো দিন তাঁকে রাখা হলো সম্পূর্ণ আইসোলেশনে। ঘরের প্রতিটি কোণায় সিসিটিভি ক্যামেরা। ২৪ ঘণ্টা এক সেকেন্ডের জন্যও সেই ক্যামেরার লেন্স তাঁর ওপর থেকে সরানো হয়নি। এমনকি তাঁর গোসলের জন্য যে জল দেওয়া হতো, সেই জলের পরিমাণও আগে ও পরে মেপে দেখা হতো, যাতে তিনি এক চুমুক জলও পান করতে না পারেন।
পরীক্ষার প্রথম কয়েক দিন ডাক্তাররা ভেবেছিলেন, শরীর যখন জল পাবে না, তখন দ্রুত ডিহাইড্রেশন শুরু হবে। রক্তচাপ বাড়বে, কিডনি বিকল হতে শুরু করবে। কিন্তু সময় যত এগোচ্ছিল, হাসপাতালের সেই মনিটরগুলোতে ফুটে ওঠা রিডিং বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়ে দিচ্ছিল। প্রহ্লাদ জানি সারাদিন ধ্যানে বসে থাকতেন। তাঁর হৃদস্পন্দন ছিল সাধারণ মানুষের চেয়েও বেশি স্থিতিশীল। পনেরোটা দিন অতিক্রান্ত হলো। একজন সাধারণ মানুষ এই অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার কথা, কিন্তু প্রহ্লাদ জানির শরীরের ওজন এক গ্রামও কমল না। তাঁর শরীরে ক্লান্তির কোনো চিহ্ন নেই, বরং তাঁর চোখের উজ্জ্বলতা দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন কোনো দৈব শক্তি থেকে প্রাণরস সংগ্রহ করছেন।
সবচেয়ে বড় চমক অপেক্ষা করছিল তখন, যখন তাঁর শরীরের আল্ট্রাসনোগ্রাফি করা হলো। চিকিৎসকরা দেখতে পেলেন, তাঁর মূত্রথলিতে সামান্য প্রস্রাব জমা হচ্ছে। কিন্তু অলৌকিক বিষয় হলো, সেই প্রস্রাব বাইরে নির্গত হওয়ার বদলে আবার মূত্রথলির দেওয়াল দিয়ে শোষিত হয়ে শরীরে মিশে যাচ্ছে। মানব শরীরের ইতিহাসে এমন ঘটনা এর আগে কখনো নথিবদ্ধ হয়নি। আধুনিক ফিজিওলজি বা শরীরতত্ত্বের সমস্ত নিয়ম সেখানে ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছিল। ভারতের এই প্রাচীন যোগবিদ্যার রহস্য ভেদ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা থমকে দাঁড়ালেন। প্রহ্লাদ জানি দাবি করতেন, তাঁর তালুর ওপর এক বিশেষ ছিদ্র আছে, যেখান থেকে এক প্রকার অমৃত বা মহাজাগতিক শক্তি নিঃসৃত হয়, যা তাঁর শরীরের পুষ্টির জোগান দেয়। যোগশাস্ত্রে একেই বলা হয় ‘খেচরী মুদ্রা’।
কিন্তু কেন ভারত সরকার এবং ডিআরডিও এই বৃদ্ধের পেছনে এত সময় আর অর্থ ব্যয় করছিল? এর পেছনে ছিল এক গভীর দেশপ্রেমিক লক্ষ্য। যদি মানুষের শরীরের এই বিশেষ ক্ষমতাকে ডিকোড করা যায়, তবে ভারতীয় জওয়ানদের জন্য তা হবে এক ব্রহ্মাস্ত্র। সিয়াচেনের মতো দুর্গম বরফের পাহাড়ে যেখানে বছরের অর্ধেক সময় রসদ পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ে, কিংবা মরুভূমির তপ্ত বালিতে যেখানে জল ছাড়া টিকে থাকা দায়—সেখানে আমাদের জওয়ানরা যদি এই কৌশল আয়ত্ত করতে পারেন, তবে ভারত হবে অপরাজেয়। খাবার বা জলের অভাব তখন আর কোনো সেনার মৃত্যুর কারণ হবে না। এই দূরদর্শী চিন্তা থেকেই প্রহ্লাদ জানিকে নিয়ে চালানো হয়েছিল সেই দীর্ঘ গবেষণা।
বিদেশের অনেক বিজ্ঞানী এই পরীক্ষা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন সিসিটিভি ক্যামেরার কোথাও হয়তো ‘ব্লাইন্ড স্পট’ ছিল। কিন্তু ভারতের বিজ্ঞানীরা সেই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁরা দেখেছিলেন, পনেরো দিন নিরবচ্ছিন্ন নজরদারির পরেও প্রহ্লাদ জানি ছিলেন সম্পূর্ণ সুস্থ। এমনকি তাঁর নাড়ি এবং হার্ট রেট একজন অল্পবয়সী যুবকের মতো কাজ করছিল। বিজ্ঞান এই ঘটনার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। এটি কেবল একজন মানুষের অলৌকিক ক্ষমতা ছিল না, এটি ছিল ভারতের হাজার বছরের প্রাচীন আধ্যাত্মিক সাধনার এক প্রমাণ, যা আধুনিক ল্যাবরেটরির টেস্ট টিউবে ধরা দেয় না।
২০২০ সালে প্রহ্লাদ জানি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সেই রহস্য আজও ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণাগারের বদ্ধ ফাইলগুলোতে বন্দি হয়ে আছে। তিনি কি সত্যিই কোনো অতিমানবিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন, নাকি তাঁর শরীর নিজেকে এমনভাবে অভিযোজিত করেছিল যা বিবর্তনবাদের নিয়মে এখনও ধরা পড়েনি? উত্তর আজও অজানা। তবে এ কথা সত্য যে, যখনই সারা বিশ্ব ভারতকে কেবল প্রযুক্তির পেছনে দৌড়ানো দেশ বলে মনে করে, তখনই প্রহ্লাদ জানির মতো মানুষরা মনে করিয়ে দেন—এই মাটির গভীরে এমন কিছু গোপন জ্ঞান লুকিয়ে আছে, যা আবিষ্কার করতে বিদেশের বিজ্ঞানীদের আরও কয়েক শতাব্দী সময় লেগে যাবে। ভারতের বীরত্ব কেবল সীমান্তে নয়, এই ধরণের রহস্যময় যোগসাধনাতেও যে ভারত বিশ্বসেরা, প্রহ্লাদ জানি তার এক জীবন্ত দলিল হয়ে থাকবেন।
SOURCES:
১. Wikipedia : “Prahlad Jani”